ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

মানুষের মানচিত্র: `লড়তেসি, তাই জিততেসি`

রেজওয়ানা আখি
প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০১৭ শুক্রবার, ১২:০১ পিএম
মানুষের মানচিত্র: `লড়তেসি, তাই জিততেসি`

শুক্রবার, ছুটির দিন হলেও ভোরের বেলা হাঁটতে বের হওয়ার মজাই আলাদা! যদিও এই বর্ষায় কখন জানি ঝুম করে এক পশলা বৃষ্টি এসে হাঁটার মজাটা দ্বিগুন করে দেয়। যদিও আকাশে একটু একটু কালো মেঘ থাকলেও বৃষ্টির আজ আর দেখা মেলেনি সকালে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কানে আসে টুং টাং শব্দ।

ধানমন্ডি ২৭। রাস্তার পাশের বটগাছ তলায় ছোট একটা চায়ের দোকানে চলছে চা সিগারেটের জম্পেশ আড্ডা। দেখেই বোঝা যাচ্ছ তারা প্রায় সবাই ভোরে হাঁটতে বের হয়েছেন। আর তাদের বেশ আয়োজন করেই চা দিয়ে যাচ্ছেন জসীম মামা। তিনি একজন চা বিক্রেতা। ছোট্ট একটি দোকান নিয়ে দিব্বি ব্যবসা করে যাচ্ছেন আর সবাইকে পরম যত্নে আপ্যায়ন করছেন তার বানানো স্পেশাল চা।



প্রতি শুক্রবারের মত এবারও বাংলা ইনসাইডারের সাপ্তাহিক আয়োজন ‘মানুষের মানচিত্র’ নিয়ে হাজির হয়েছি আমি রেজওয়ানা আখি। এবারের গল্পের নায়ক জসীম মামা। তবে এই গল্প তার দুঃখ মাখা জীবনের নয়। বরং সুখের গল্প, ছোট চাড়া থেকে বড় বৃক্ষে বেড়ে ওঠার গল্প।
গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা। বয়স ৩৫ হবে। ধানমণ্ডির প্রত্যেকটা পথ তার খুব ভালোভাবে চেনা। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি চা বিক্রি করে যাচ্ছেন। এই পথ ধরে হাজার হাজার মানুষের চলাচল। তারই পাশে একটি বট গাছের নিচে ছোট্ট একটি দোকানে চা বিক্রি করে এগিয়ে চলে তার জীবনের প্রতিটা ক্ষণ।



তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, অনেক পড়াশোনা করে শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে একটি ভালো চাকরি করার আশা ছিল কিন্তু পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে তার সেই স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে গেছে।

’১৫ বচ্ছর বয়স থেকেই চা বেঁচি। তখন ফ্লাক্সে বেঁচতাম, এই ধানমন্ডি লেকে, পার্কে, রাস্তায় রাস্তায়। এক স্যার গাড়ি নিয়া আসতো লেকের পাশে, সে প্রত্যেকদিন আমার কাছ থেইকা চা খাইত আর যাওয়ার সময় আমারে ১০০ টাকা দিয়ে যাইত। একদিন এলাকার ছেলেপেলেদের সঙ্গে ঝামেলা হইয়া আমার ফ্লাক্স ভাইঙ্গা যায়। ওইদিন ওই স্যার আইসা শুনসে। পরে সে আমারে একটা ছোট দোকান দিয়া দেয়। ওই লেকের পাশেই ছোট একটা দোকান।’

এরপর থেকেই চা বিক্রিই তার জীবনের পেশা হিসেবে পরিণত হয়। চা স্টলটি পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকার লড়াই। এখন তিনি একটু বড় করেই একটা দোকান দিয়েছেন, তবে ধানমন্ডি ছাড়েন নি, বলা যায় ধানমন্ডি তাঁকে ছাড়ে নি।



তিনি বলেন, দিনে কম বেশি ৮’শ কাপ চা বানানো লাগে। এই আয়ের মধ্য দিয়েই তিনি তার ছোট বোনকে বিয়ে দিয়েছেন, আর একমাত্র সন্তানকে স্কুলে পড়াচ্ছেন, চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে ছেলে। শত অভাব-অনটনের মধ্যেও যে তিনি তার সন্তানকে শিক্ষা দিতে পারছেন এটাই তার জীবনের বড় পাওয়া। শুধু তার সন্তানের পড়াশুনা শেষে ভালো একটি চাকরি পেলেই তার জীবনের সব চাওয়া পূর্ণ হবে। এমন আশায় বুক বেধে রয়েছেন জসীম মামা।

তিনি বলেন, এই সীমিত আয় দিয়েই সন্তানের পড়াশোনার খরচসহ পরিবার চালাতে হয়। এতে অনেক সময় সংসারের খরচ বহন করতে তাকে হিমশিম খেতে হয় বইকি।

তারপরও হার মানে নি জসীম মামা। এভাবেই চলছে জীবন, বরং তার মতে অনেক ভালোভাবেই কাটছে তার দিন ও রাত। তিনি বলেন, ‘কষ্ট কার জীবনে নাই? তাই বলে কি আশা ছাইড়া দিমু? লড়লেই না জেতা যায়। তাই লড়তেসি, আল্লাহ্‌র রহমতে, জিততেসিও’।

বাংলা ইনসাইডার/আরএ/টিআর