ঢাকা, মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

ট্রান্সফার উইন্ডো

দাউদ রশিদ
প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০১৭ বৃহস্পতিবার, ০৭:০৬ পিএম
ট্রান্সফার উইন্ডো

একবার করে ট্রান্সফার উইন্ডো খোলে আর বিশ্ব ফুটবলের বড় ক্লাবগুলো টাকার থলে নিয়ে হাজির হয়। লক্ষ্য থাকে ফুটবলারদের সই করানো। ফুটবলারদের সই করাতে কোটি কোটি অর্থ খরচ করে ক্লাবগুলো। রোনালদো, মেসিরা তো রয়েছেনই দলবদলের এই ক্লাবযুদ্ধে কোটি কোটি টাকা দর ওঠে বহু ফুটবলারেরই। সে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে আসা পল পোগবাই হোক বা গনসালো ইগুয়াইন, এডেন হ্যাজার্ড। একবার দেখে নেওয়া যাক বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলারদের তালিকায় কারা রয়েছে।

ইংলিশরা ফুটবল আবিস্কারের পর মৌখিক ভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়েই একজন খেলোয়াড় একটি দলের হয়ে খেলতে পারতেন। কিন্তু এরপর ১৮৮৫ সালে ইংলিশ ফুটবল ফেডারেশন খেলোয়াড় দলবদলকে একটি নিয়মনীতির ভেতরে নিয়ে আসে। এরপরও অনেক বছর মৌখিক ভাবেই স্বীকৃতি নিয়ে খেলোয়াড়ের দাম পরিশোধ করে দলে নিয়ে খেলোয়াড় খেলানো যেত। কিন্তু খেলোয়াড়দের সঙ্গে লিখিত চুক্তি করার পদ্ধতি চালু হয় ১৯৯৫ সালে। এরপর থেকেই চুক্তিপত্রে সইয়ের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হচ্ছে।

ইউরোপের কোনো ক্লাব দক্ষিণ আমেরিকার বা অন্য কোন মহাদেশের কোন দেশের ক্লাবের কাছ থেকে খেলোয়াড় কিনতে চাইলে দুই ক্লাবই ঠিক করে নিতে পারে যে তারা কীভাবে টাকা নিবে বা পরিশোধ করবে। এটি মূলত দুই পক্ষের নিজেদের মতামতের উপর ভিত্তি করে।

ট্রান্সফারের সময়
ইউরোপিয়ান ফুটবলে মূলত দুই সময়ে খেলোয়াড় কেনাবেচা হয়। প্রথমবার নতুন মৌসুম শুরু আগে যা সাধারণত ১২ সপ্তাহের। এবং পরেরটি ৪ সপ্তাহের, সেটা হয় হচ্ছে অর্ধ মৌসুম শেষ হবার পর।

১৯৯০ এর দিকে খেলোয়াড় কেনাবেচার ব্যাপারটি বেশ ভাল ভাবে শুরু করার তাগিদ দিলেও ইউরোপীয়ও ইউনিয়ন সেটি বাস্তবায়ন করে ২০০২-০৩ মৌসুম থেকে। এটা মূলত প্রথমে অফিসিয়াল ভাবে শুধু ইংল্যান্ডেই চালু করা হয়।

ইউরোপের সব বড় বড় ফুটবল লিগে ট্র্যান্সফার উইন্ডো মূলত শুরু হয় জুলাইয়ে এবং শেষ হয় আগস্টের শেষ দিন। অন্যদিকে মৌসুমের মাঝামাঝিতে এসে জানুয়ারি মাসে শুধু একমাসের জন্য আবারও খেলোয়াড় কেনার বা বিক্রির সেই সুযোগ করে দেওয়া হয়।

আবহাওয়া বা অন্য অনেক কারণেই আমেরিকা এবং কানাডায় ট্র্যান্সফার উইন্ডো শুরু হয় মার্চ মাসের এক তারিখ থেকে এবং শেষ হয় ৩০ এপ্রিল। আবার আগস্টের ১-৩১ তারিখ পর্যন্ত মৌসুমে খেলোয়াড় কেনবেচার জন্য ট্র্যান্সফার উইন্ডো খোলা থাকে।

ইংল্যান্ডে মূলত ট্র্যান্সফার উইন্ডো শুরু হয় ৯ জুন। কিন্তু অনেক খেলোয়াড়ের দলবদল ১ জুলাইয়ের আগে সম্ভব হয়না কারণ অনেক খেলোয়াড়ের চুক্তিই শেষ হয় ৩০ জুন।

ট্র্যান্সফার উইন্ডোর শেষদিনকে ডেডলাইন ডে বলা হয়। ২০০৮ সালে সেটা একদিন বাড়িয়ে ১ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত করা হয় কিছু ব্যাবসায়িক কারণে। যাদের সঙ্গে ক্লাবের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায় তাদের ট্র্যান্সফার উইন্ডো চলা কালীন যখন ইচ্ছে দলে ভেড়ানো যায়। দলবদলের প্রথম ভাগে নভেম্বরের ৪র্থ সপ্তাহে শেষ বৃহস্পতিবার বিকেল ৫ টা পর্যন্ত এবং দ্বিতীয়ভাগে মার্চের ৪র্থ সপ্তাহে শেষ বৃহস্পতিবার বিকেল ৫ টা পর্যন্ত দলে ভেড়ানো যায়। লোনে থাকা খেলোয়াড়দেরকে সিজনের যে কোন সময়েই পাকাপাকি ভাবে দলে নিয়ে নেয়া যায়, এমনকি ট্রান্সফার উইন্ডো খোলা না থাকলেও সেটি করা যায়।

ক্লাবগুলো কীভাবে এত টাকা খরচ করে?
বিগত কয়েক মৌসুম ধরে ট্রান্সফার উইন্ডোতে ফুটবলারদের ট্রান্সফার ফি হয়ে উঠেছে আকাশচুম্বী। অথচ কিছুদিন আগেও ফুটবলারদের দলবদলে এত টাকা ঢালার কথা চিন্তা করাও যেত না । কিন্তু বর্তমানে পছন্দের খেলোয়াড়কে দলে টানার ক্ষেত্রে টাকা ঢালতে কোনো কার্পণ্য করে না ক্লাবগুলো। তাই তো ২০০১ সালে জিনেদিন জিদানের ৭৫ মিলিয়ন ইউরোর ট্রান্সফার ফি এর বিশ্বরেকর্ড ভাঙতে যেখানে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ৮ বছর , যা ভেঙেছিল ২০০৯ সালে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ৯৪ মিলিয়ন ইউরোর ট্রান্সফার ফি`র মাধ্যমে। কিন্তু এই রেকর্ড ৭ বছরের মধ্যেই দুবার হাতবদল হয়েছে । একবার হয়েছে ২০১৩ সালে গ্যারেথ বেলের ১০০ মিলিয়ন ইউরোর ট্রান্সফারের মাধ্যমে, আর সর্বশেষ হয়েছে ২০১৬ সালে পল পগবার ১০৫ মিলিয়ন ইউরোর দলবদলের দ্বারা।  ট্রান্সফার মার্কেটে এই টাকার বর্ষণ কখনো প্রশংসার আবার কখনো হাস্যকর। আবার কখনোবা বিতর্কিত।

খুব কম ম্যানেজারই আছেন যারা নিজে তাদের পছন্দের খেলোয়াড়কে মানিয়ে নিজেদের দলে টানতে পারেন। দলবদলের ক্ষেত্রে ক্লাবের মালিক ও প্রেসিডেন্টই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। কারণ প্রসিডেন্টই  ম্যানেজারকে মুক্তহাতে দলবদলে টাকা ঢালার ব্যাপারে সবুজ সংকেত দেন। তাছাড়া দলে খেলোয়াড় টানার সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা তার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।

কিন্তু দর্শকদের কাছে অবাক করা ব্যাপার হলো প্রতি বছরই বিভিন্ন বড় ক্লাবের ঋণগ্রস্ত হওয়ার ব্যাপারটা, তার চেয়েও বড় অবাক করা ব্যাপারটি হলো ঋণের অঙ্কটা। কিন্তু প্রতি বছরই ক্লাবগুলোর বড় অঙ্কের দলবদল তাদের ঋণগ্রস্ত হবার ব্যাপারটি ঠিক তুলে ধরতে পারে না। তবে ঋণগ্রস্ত হবার পরেও ক্লাবগুলোর বড় বড় অঙ্কের দলবদল কখনো ক্লাবের ভক্তকুল এবং বিশাল ব্র্যান্ড ইমেজ কখনো কোন প্রকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয় না, কারণ এখানে শর্তহীন ঋণের একটা ব্যাপার আছে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে – শর্তহীন ঋণ জিনিসটা কি? একটি ক্লাবের আয়ের বিভিন্ন উৎস থাকে।  তবে কেবল ৩টি জিনিসই আছে যা তাদের আয়ের অঙ্ক রাতারাতি বড় করতে পারে। ট্রান্সফার ফি, টিকেট স্বত্ব এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টিভি স্বত্ব। এগুলোই মূলত একটি ফুটবল ক্লাবের আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু আয়ের এত এত উৎস থাকার পরেও ফুটবল ক্লাবগুলো প্রতি বছরই ঋণগ্রস্ত হচ্ছে।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড , রিয়াল মাদ্রিদের মত বড় বড় ক্লাবগুলো রয়েছে শীর্ষ তালিকায়। কিন্তু প্রতি বছরেই দলবদলের বাজারে খরচের দিক দিয়ে তারাই আবার অন্য ক্লাবগুলোর তুলনায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকে। এখানেই শর্তহীন ঋণের ব্যাপারটি জড়িত, যা ঋণগ্রস্ত হবার পরেও ক্লাবগুলোর বড় অঙ্কের সাইনিং এ মূখ্য ভূমিকা রাখে। কিন্তু কেবলমাত্র বড় বড় ক্লাবগুলোই পারে এক্ষেত্রে শর্তহীন ঋণদাতাদের প্রলোভন দেখাতে।

প্রথমত এ ধরনের অর্থায়নের  জন্যে দুইটি উপায় আছে, একটি হলো ন্যায্যতা বা সম্যভাব এবং অন্যটি হলো শর্তহীন ঋণ। ন্যায্যতা বা সম্যভাবের ক্ষেত্রে যেসব ক্লাবে বিনিয়োগকারীরা অর্থ ঢালছে, সেক্ষেত্রে একটু ঝুঁকিই নিতে হয়। অন্যদিকে শর্তহীন ঋণের ক্ষেত্রে সোজাসাপ্টা ঋণদান এবং সুদ বা মুনাফার ক্ষেত্রে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা হয়। এখানে ক্লাবগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ডের ভিত্তিতে এবং নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে ঋণ পরিশোধের চুক্তিতে ঋণগ্রহণ করে থাকে। এখন আরেকটি প্রশ্ন হতে পারে যে বড় ক্লাবগুলো কেন সহজেই বিনিয়োগকারী ও ঋণগ্রহীতাদের এ ধরণের লেনদেনে আগ্রহী করে তুলতে পারে ?

ব্যাংক বা ফার্ম বা যেসব প্রতিষ্ঠান এ ধরণের লেনদেন করে থাকে, বিভিন্ন ক্লাবকে ঋণদানের ব্যাপারে তাদের কঠোর নীতি অবলম্বন করতে হয়। ঋণদানের ক্ষেত্রে তাই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ক্লাবকেই প্রাধান্য দেয়। রিয়াল মাদ্রিদ আর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো ক্লাবগুলোর আর্থিক অবস্থান এমন পর্যায়ে পৌছেছে, যেখানে তারা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বড় অঙ্কের অর্থ ঋণ নিয়েও মুনাফাসহ ঋণ নেওয়া অর্থ পরিশোধের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী থাকে। ক্লাবগুলোর এ ধরণের লেনদেনে বড় ভূমিকা রাখে সেই ক্লাবের ফ্যানবেস। বলতে গেলে ক্লাবের প্রতি সদা অনুগত ভক্তরাই ক্লাবের এ ধরণের আর্থিক লেনদেন সহজ করে দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কথা। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের অবসরের পর টানা ৩ মৌসুম তেমন কোন বড় সাফল্য অর্জন করতে পারেনি রেড ডেভিলরা। কিন্তু প্রতি বছরই তারা আর্থিক দিক দিয়ে লাভবান ছিল।

এটি ভাবার কারণ নেই যে ক্লাব নিজের দক্ষতাতেই লাভের মুখ দেখেছে। বরং ম্যানইউর ফ্যানবেসই ক্লাবের ব্র্যান্ডে পরিণত হয়ে ক্লাবের আর্থিক স্বচ্ছলতায় প্রধান ভূমিকা রেখেছে। বিনিয়োগকারীরা এ ব্যাপারেও অনেকটা নিশ্চিত ও আত্মবিশ্বাসী যে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মত ক্লাব কখনোই কোনো কারণে বিশেষ করে আর্থিক দিক থেকে অসম্মানের শিকার হবে না। একই কথা প্রযোজ্য রিয়াল মাদ্রিদের ক্ষেত্রেও। মূলকথা হলো বড় অঙ্কের ঋণ নিলেও বড় বড় ক্লাবগুলো যেকোন মূল্যে ঋণ পরিশোধে সক্ষম। মূলত এ কারণেই বিনিয়োগকারীরা শর্তহীন ঋণপ্রদানের ক্ষেত্রে বড় ক্লাবগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

ক্লাবগুলোর আয়ের ক্ষেত্রে আরও একটি বড় উৎস হলো মার্চেন্ডাইস বা পণ্য। এদিক দিয়েও ক্লাবগুলো ঋণগ্রস্ত হয়েও সহজেই আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে। রিয়াল মাদ্রিদ যেমন কেবল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও গ্যারেথ বেলের নামাঙ্কিত জার্সি বিক্রির মাধ্যমেই অল্প সময়েই তাদের দলে টানতে ব্যয় হওয়া রেকর্ড ট্রান্সফার ফি`র অর্থ উঠিয়ে নিয়েছে এবং তা ক্লাবের ও ব্র্যান্ডের আর্থিক সমৃদ্ধিতেও ভূমিকা রেখেছে।


বাংলা ইনসাইডার/ডিআর