ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

শিল্পী সঙ্কটে নাটক- সিনেমা

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ জুলাই ২০১৭ বৃহস্পতিবার, ০৮:৩০ পিএম
শিল্পী সঙ্কটে নাটক- সিনেমা

শিরোনামের সঙ্গে আপনিও নিশ্চয়ই একমত। যদি আপনি সিনেমা বা নাটকের নিয়মিত দর্শক হয়ে থাকেন। এই মুহুর্তে সিনেমায় যেমন প্রকট হারে চলছে নায়ক -নায়িকা সঙ্কট। তেমনি ছোট পর্দায়ও একই মুখ বারবার দেখে দর্শক বিরক্ত।

‘মুখ ও মুখোশ’ ছবি দিয়ে যাত্রা শুরু ঢাকাই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির। এ ছবিতে প্রথম বাংলা সিনেমার নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন আমিনুল হক। তারপর বাংলা সিনেমায় নায়ক হয়ে আসেন ফজলে লোহানী, আনোয়ার হোসেন, শওকত আকবর, আজিম, খলিলুল্লাহ খান খলিল, মেহফুজ, আকতার হোসেন, নারায়ণ চক্রবর্তী।

৬০ দশকে কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে ‘বেহুলা লখিন্দর ছবিতে সর্বপ্রথম নায়ক হয়ে অভিনয় করেন নায়ক রাজ রাজ্জাক। এরপর এহসান, রহমান, ফারুক, বুলবুল আহমেদ,আলমগীর, সোহেল রানা, দারাশিকো, রাজ, আহমেদ শরীফ, ওয়াসিম, বেবি জামান চলচ্চিত্রে নাম লেখান। সত্তর দশকের শুরুতে ‘বসুন্ধরা’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হন নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। এরপর চলচ্চিত্রে আসেন উজ্জ্বল, মাহমুদ কলি।

১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতায় শুরু হয় - ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ এই প্রকল্পে নায়ক হয়ে আসেন মান্না, অমিত হাসান, জসিম মোহাম্মদ, সুব্রত চক্রবর্তীসহ আরো অনেকে।

তাঁদের পরবর্তী সময়ে আসেন ওমরসানি, আমিন খান, নাঈম, সালমান শাহ ও মান্না।  বাংলা চলচ্চিত্রে মান্না ও সালমান শাহ ‘সুপারস্টার’ খেতাব অর্জন করেন। তবে নিয়তির নির্মম পরিহাস নায়ক মান্না ও সালমান শাহ অকাল মৃত্যু হয়।

এদিকে সালমান শাহর শূন্যস্থান পূরণ করার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রে অভিষেক হন এক ঝাঁক অভিনেতা। এদের মধ্যে শাকিল খান, রিয়াজ, ফেরদৌস। সে সময়-এই তিন নায়কের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হলেও তাদের মধ্যমনি হয়ে ‘সুপারস্টার’ খেতাব নিয়ে অভিনয় করে চলছিলেন নায়ক মান্না।

প্রায় একই সময়ে চলচ্চিত্রে অভিষিক্ত হয় শাকিব খান। মান্নার মৃত্যুর পর প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ‘সুপারস্টার’ হিসেবে খেতাব পান শাকিব খান। তার পরবর্তীতে বাপ্পী, সাইমন ও আরেফিন শুভদের দিয়ে সিনেমা চলছে। সে চলাকেচলা বলে না। এক শাকিবময় সিনেমা। বাকীদের নিয়ে দর্শকদের নেই কোন আগ্রহ।

এ সময়ে নায়িকারাও নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারছেন না। আসা-যাওয়ার মাঝে হয়তো কিছু আলোর ঝলকানি দেখাচ্ছে।

ববিতা, কবরী, শাবানা, সুচন্দা, সুচরিতা, আঞ্জুমান, ডলি জহুর, আনোয়ারা সবাই নিপুন অভিনয়শৈলী দিয়ে মানুষের হৃদয়ে শক্তপোক্ত অবস্থান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এবং আজও তাঁরা নিজেদের জায়গায় অধিষ্ঠিত রয়েছেন।

পরবর্তীকালে নব্বই এর দশকের শেষের দিকে আগমন ঘটে শাবনুর, মৌসুমী, দিতি, চম্পা সহ বেশ কয়েকজনের। তাঁরাও অগ্রজদের অনুসরণ করে বাংলা সিনেমাকে এগিয়ে নিয়েছে অনেকটা পথ।

এবার একটু আসি বর্তমান সময়ের দিকে। এখন বলতে গেলে বাংলা সিনেমা মানেই অপু,মাহি, পরিমনি, নুসরাত ফারিয়া, ববি,আঁচল ছাড়া নায়িকা নেই বললেচলে। আর যাদের নাম উচ্চারিত হচ্ছে। তাঁরা কেউ নিজ দক্ষতায় জায়গা তৈরি করতে পারেননি। প্রত্যেকেই নায়ক নির্ভর। এই আছি এই নেই অবস্থা।

এভাবে কতদিন চলতে পারে ইন্ড্রাস্ট্রি? একটা সময়ে বছর প্রতি শাকিবের ছবির সংখ্যা কমে গেলে। হলগুলোর কী অবস্থা হবে? খোজ নিয়ে জানা যায়। এক শাকিব ছাড়া আর কারো ছবি লগ্নিকৃত টাকা ফেরত আনতে পারে না। তাহলে কীভাবে হবে? এফডিসিতে নেই নতুন মুখের সন্ধান। পরিচালকরা নতুন কিছু সৃষ্টি না করে। রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত।

টেলিভিশনেরও একই অবস্থা। একই মুখ দেখে দর্শক বিরক্ত। একটা সময়ে টেলিভিশন সেটের সামনে দেশের নাটক দেখতে বসলেই জাহিদ হাসান, শহীদুজ্জামান সেলিম, বিপাশা হায়াত, তৌকীর আহমেদ, শমী কায়সার, আফসানা মিমি, তানিয়া আহমেদদের মতো জনপ্রিয় সব শিল্পীকে দেখা যেত। এখনও তাঁদের কমবেশি দেখা যায়। এখনও তাদের নিয়ে দর্শকের মাঝে অন্যরকম আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়।

পরবর্তী সময়ে কালে কালে অনেক অভিনয় শিল্পীই মিডিয়ায় এসেছেন। কাজ করেছেন বা করছেন নতুন নতুন শিল্পীরা। কিন্তু আগের শিল্পীদের নিয়ে যে আগ্রহ বা তাদের যে পরিচিতি রয়েছে সেটার কোনো প্রভাব এ প্রজন্মের শিল্পীদের নেই বললেই চলে। নতুন এ শিল্পীদের নিয়ে নির্মাতারা বহু নাটক নির্মাণকরলেও দর্শক তাদের ঠিকভাবে চেনেন না। সর্বশেষ মোশাররফ করিম, নুসরাত ইমরোজ তিশা,চঞ্চল, মম, অপূর্ব, নিশোদের মত গুটি কয়েকজনের আবির্ভাব ঘটেছে। সময়ের গল্প গুলো নির্মান হচ্ছে জোভান , সিয়াম, মেহজাবিন, তাওসিফ দের নিয়ে। কিন্তু তাঁদের অভিনয় এখনো দর্শকের কাছে গ্রহনযোগ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌছতে পারেনি। তাদের দর্শক বলতে অনলাইনে যারা নিয়মিত। শহর ছাড়িয়ে নেই তাদের গ্রহনযোগ্যতা।

এত এত শিল্পী কাজ করলেও ড্রইং রুম মিডিয়ায় শিল্পী সংকট রয়েছে বলেই মনে করছেন অনেকে। টিভি মিডিয়ায় এ সময়ে অনেক নতুন মুখ কাজ করলেওতাদের বেশিরভাগেরই অভিনয়ের ওপর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান নেই।

দৈহিক সৌন্দর্যের কারণে দু-একটি বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে আসছেন অভিনয়ে। কিন্তু একজন শিল্পীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অভিনয় জানা। সেটা যদি না থাকেদর্শক তাকে গ্রহণ করবেন কেন? আর ইদানীং অনেক নির্মাতাকেই দেখা যায় সেসব দর্শনধারী শিল্পীকে নিয়ে কাজ করছেন হরহামেশাই। অভিনয়ের ন্যূনতমযোগ্যতা যাদের নেই তাদের নিয়ে কাজ করার কারণে নাটকের মানও কমে গেছে অনেকাংশে।

বিশিষ্ট অভিনেতা ও নির্মাতা মামুনুর রশীদ বলেন ,‘মঞ্চ হলো অভিনয়ের আঁতুড়ঘর। কিন্তু সেই আঁতুড়ঘরে অভিনয় জানা দক্ষ শিল্পী কাজ করলেও তাদেরউঠিয়ে আনছেন না কেউ। গুটি কয়েকজন নিজ যোগ্যতা বলে টিভি পর্দায় নিজের অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু বাকিরা কোনো সুযোগ পাচ্ছেননা। আর সেটার কারণ নির্মাতা-টেলিভিশন চ্যানেল এমনকি বিজ্ঞাপন এজেন্সির একটা বড় অংশের চাহিদার জায়গা ওই দর্শনধারী গ্ল্যামারাস মডেলদেরদিকে।’

বর্তমান সময়ে টিভি মিডিয়ায় শিল্পী সংকটের আরেকটা কারণ হলো রিয়েলিটি শো। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিভিন্ন টিভি চ্যানেল প্রায়ই সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সেসব রিয়েলিটি শো থেকে উঠে আসা তারকাদের দিয়ে অভিনয়ে আনার চেষ্টা করা হলেও ব্যর্থই হতে হয়েছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে।

কারণ যাদের তুলে আনা হয় তাদের অধিকাংশই অভিনয় তেমন একটা জানেন না। আর যখন দর্শক সাড়া না পান সেসব তারকা নিজ থেকেই মিডিয়া থেকেউধাও হয়ে যান। এ কারণে মিডিয়ায় শিল্পী সংকট তৈরি হচ্ছে। আবার অনেক ভালো শিল্পীর সন্ধান পাওয়া গেলেও একটা সময় তিনি নাটকে থাকছেন না।টিভি পর্দাকে বিদায় দিয়ে চলচ্চিত্রে নাম লেখাচ্ছেন। চলচ্চিত্রে যাওয়ার কারণে ওই শিল্পীকে টিভি নাটকের দর্শক আর দেখছেন না।

অনেক ক্ষেত্রে অলরাউন্ডারদের জন্যও টিভি নাটকে অস্থিরতা বিরাজ করছে। কেউ একজন এসে নাটকে অভিনয় করছেন। কিছুদিন পর আঁটঘাট বেঁধেঅভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাণ ও প্রযোজনায় নাম লেখান। তিন মাধ্যম নিয়ে ভাবতে গিয়ে টানাপড়েনে পড়ে যান। শুধু তাই নয়, একটা সময় তাকেও মিডিয়াথেকে ছিটকে পড়তে হয়। দেখা যায় অভিনয়শিল্পী হিসেবে তার উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকলেও নানামুখী ভাবনার জন্য টিকতে পারেন না। একজন শিল্পী মিডিয়ায়আসলে তাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা না করায় হারিয়ে যান অনেক সময়।

দেখা গেছে একজন অভিনেত্রী অভিনয়ে পারদর্শী। কিন্তু তাকে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও ইভেন্ট গ্রুপ উপস্থাপনার জন্য প্রস্তাব দেয়। সেসময় প্রলুব্ধ হয়ে সেশিল্পী অভিনয়ের চেয়ে উপস্থাপনায় মনোযোগী হয়ে পড়েন। আর তখনই সে শিল্পীর শিল্পগুণ নষ্ট হয়ে যায়।

এভাবেই যাচ্ছে বর্তমান সময়ে নাটকের হালচাল। তবে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান সব নাট্যবোদ্ধার। টিভি অঙ্গনের এসব জটিলতা কাটিয়ে উঠেশিল্পীদের সদ্ব্যবহার করে শিল্পী সংকট দূর করার দাবি করছেন তারা।


বাংলা ইনসাইডার/এমআরএইচ