ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

আবদুল হামিদ কততম রাষ্ট্রপতি?

মাহমুদুল আলম
প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০১৭ রবিবার, ০৮:০৬ এএম
আবদুল হামিদ কততম রাষ্ট্রপতি?

বঙ্গভবনের ওয়েবসাইটে সাবেক রাষ্ট্রপতিদের বিষয়ে হযবরল তথ্য দেওয়া আছে। এতে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে দায়িত্ব পালন করা রাষ্ট্রপতিদের ‘অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি’, ‘ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি’ ও ‘রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার পরপর একাধিক মেয়াদে থাকা রাষ্ট্রপতিদের কাউকে একই ক্রমিকে আবার কাউকে ভিন্ন ভিন্ন ক্রমিকে দেখানো হয়েছে।

সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে ক্ষেত্রমত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করিবেন।’

এই অনুচ্ছেদ অনুসারে দায়িত্ব পালন করা তিন সাবেক রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবদুস সাত্তার ও সাহাবুদ্দিন আহমদের নামের পাশে ব্র্যাকেটে লেখা আছে ‘অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি’। মুহম্মদুল্লাহ্ ও মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকারের নামের পাশে একইভাবে লেখা আছে ‘রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত’। আবার বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের জীবনীতে লেখা আছে, ‘প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকাকালে ১৪ মার্চ ২০১৩ থেকে জনাব মো. আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০ মার্চ ২০১৩ তারিখে রাষ্ট্রপতি জনাব জিল্লুর রহমান মৃত্যুবরণ করলে তিনি সেদিন থেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।’ অর্থ্যাৎ তাঁকে দুই মেয়াদে দুইভাবে (‘ভারপ্রাপ্ত’ ও ‘অস্থায়ী‘ ) উল্লেখ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির কার্যালয় বঙ্গভবনের ওয়েবসাইটে দেওয়া এই জীবনীতে আরও বলা হয়েছে, তিনি দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি। অথচ নির্বাচিত হয়ে শপথ নেওয়ার আগে তিনি ‘ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি’ ও ‘অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি‘র দায়িত্ব (জীবনী অনুসারে) পালন করায় ওই দুইটির আলাদা ক্রমিক ২২ ও ২৩ নম্বার হওয়ার কথা। আর বর্তমান ক্রমিক হওয়ার কথা ২৪। কারণ তালিকায় পরপর ৪ ও ৫ নম্বর ক্রমিকে থাকা সাবেক রাষ্ট্রপতি মুহম্মদুল্লাহ্ এবং ১০ ও ১১ নম্বর তালিকায় থাকা আবদুস সাত্তারকে প্রথম বার ‘অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। যদিও তাঁরাও বর্তমান রাষ্ট্রপতির মতো সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ অনুসারে শপথ নিয়ে পরপর একাধিক মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ছিলেন।

এমনকি একই তারিখ ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ মেয়াদ শুরু করে প্রথম ও দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি যথাক্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে আছেন ভিন্ন ভিন্ন ক্রমিক নম্বরে।

তাছাড়া পরপর বিভিন্ন মেয়াদে থাকা একাধিক সাবেক রাষ্ট্রপতিকে একই ক্রমিক নম্বরে না দেখিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ক্রমিক নম্বরে দেখালে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদের ক্রমিন নম্বর যাবে আরও পরে।

এদিকে ওয়েবসাইটে ঢুকলেই প্রথম পাতায় ডান পাশে রাষ্ট্রপতির ছবির সঙ্গে লেখা আছে, ‘মো: আব্দুল হামিদ বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি’। এখানে রাষ্ট্রপতির নামে ‘আব্দুল’ শব্দটি যুক্তাক্ষরে লেখা আছে। তবে বিস্তারিততে ক্লিক করলে জীবন বৃত্তান্তে দেয়া নামের বানানে আছে ‘আবদুল’। একই ভাবে প্রথম পাতায় ‘১৯তম‘ রাষ্ট্রপতি লেখা হলেও বিস্তারিততে লেখা আছে ’২২-তম’। তালিকার উৎস হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নাম দেয়া আছে। সর্বশেষ গত ৫ জুলাই তা হালনাগাদ করা হয়েছে বলে তথ্য দেওয়া হয়েছে এতে।

তালিকায় পরপর একাধিক মেয়াদে থাকা সাবেক রাষ্ট্রপতিদের ক্রমিকেও আছে ভিন্নতা। যেমন আবু সাঈদ চৌধুরী পরপর তিন মেয়াদের রাষ্ট্রপতি। মেয়াদগুলো হচ্ছে ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ থেকে ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭২, ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭২ থেকে ১০ এপ্রিল ১৯৭৩ এবং ১০ এপ্রিল ১৯৭৩ থেকে ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৩। তবে তাঁকে একই ক্রমিকে (৩ নম্বর) রাখা হয়েছে। একইভাবে জিয়াউর রহমান পরপর দুই মেয়াদের রাষ্ট্রপতি। মেয়াদ দুটি হচ্ছে ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ থেকে ১২ জুন ১৯৭৮ এবং ১২ জুন ১৯৭৮ থেকে ৩০ মে ১৯৮১। তাঁকেও একই ক্রমিকে (৯ নম্বর) দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি দেখানো হয়েছে। তবে ভিন্নতা আছে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জন্য। তিনিও পরপর দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তবে তাঁকে আলাদা ক্রমিকেই (১৩ ও ১৪ নম্বর) রাষ্ট্রপতি দেখানো হয়েছে। তাঁর দুইটি মেয়াদ হচ্ছে ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ থেকে ২৩ নভেম্বর ১৯৮৬ এবং ২৩ নভেম্বর ১৯৮৬ থেকে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সাল।

তাছাড়া তালিকায় সাবেক রাষ্ট্রপতিদের নামও লেখা আছে ভুল বা ভিন্ন বানানে। যেমন আবু সাঈদ চৌধুরীর নামের বানানে ‘চৈধুরী’ লেখা হয়েছে। দুই ক্রমিকে এরশাদের নামের বানানে ‘হোসেন’ ও ‘হুসেইন’ এবং ‘মোহাম্মদ’ ও ‘মুহম্মদ’ লেখা হয়েছে। আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের নামের প্রথম শব্দ দুটি একশব্দে লেখা হয়েছে ‘আবুসাদাত’।

১৮তম রাষ্ট্রপতির নাম লেখা আছে ‘এ, কিউ, এম, বদরুদ্দোজা চৌধুরী’। তবে জাতীয় সংসদের ওয়েবসাইটে সপ্তম সংসদের সদস্য হিসেবে তাঁর নাম লেখা আছে ‘এ.কিউ.এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী’। আর ১৯তম রাষ্ট্রপতির নাম লেখা আছে ‘মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার’। তবে সংসদের ওয়েবসাইটে সাবেক স্পিকার হিসেবে তাঁর নাম ইংরেজিতে লেখা আছে ‘মুহম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার‘। অর্থ্যাৎ এখানে ‘জমিরউদ্দিন’ একশব্দে লেখা আছে।

এছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতিদের নামের আগে-পরে রয়েছে মূল নামের অতিরিক্ত নানা শব্দ। যেমন: জমিরউদ্দিন সরকারের মূল নামের আগে যথাক্রমে ‘স্পিকার’ ও ‘ব্যারিস্টার’, জিয়াউর রহমানের নামের আগে ‘মেজর জেনারেল’ ও পরে ‘বীর উত্তম, পিএসসি’, এরশাদের নামের আগে ‘লে: জেনারেল’ ও পরে ‘এন ডি সি, পি এস সি’ লেখা আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রের প্রথম ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি। তাঁদের মূল নামের আগে-পরে এসব কিছু থাকা একদমই ঠিক নয়, তাতে বিষয়টির গুরুত্ব হালকা হওয়ার ঝুঁকি আছে। বিশিষ্টজনরা বলছেন, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি থাকা একটি সংবিধান স্বীকৃত বিষয়। তাই তাঁর নামের শুরুতে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি রেখে অন্যান্য সাবেক রাষ্ট্রপতিদের ক্ষেত্রে বাড়তি শব্দগুলো বাদ দেয়া উচিত। তাছাড়া রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে সাবেক রাষ্ট্রপতিদের বিষয়ে এত ভুল-ভ্রান্তি থাকা কোনভাবেই সমীচীন নয়।

১৫তম ক্রমিকে সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের মেয়াদেও ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে। এতে তাঁর এই মেয়াদ লেখা আছে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ থেকে ৯ অক্টোবর ১৯৮১। মূলত যা ১৯৮১ এর স্থলে ১৯৯১ সাল হবে।

রাষ্ট্রপতিদের তালিকার দেখতে ক্লিক করুন। http://bit.ly/2uuAf2E


বাংলা ইনসাইডার/এমএএম