ঢাকা, মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

মন্ত্রী-এমপিদের নিয়ে বিপাকে সরকার

মাহমুদুল আলম
প্রকাশিত: ২২ মে ২০১৭ সোমবার, ০৮:০৫ এএম
মন্ত্রী-এমপিদের নিয়ে বিপাকে সরকার

একাত্তরে মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক শীর্ষ অপরাধীদের দণ্ড কার্যকর, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিনারক্তপাতে ৬৮ বছরের ছিটমহল বিনিময়সহ নানা সাফল্যের পরও জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে উৎকণ্ঠা কাটছে না ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের। এর মূল কারণ দলীয় মন্ত্রী-এমপিদের কুকীর্তি।

কক্সবাজারের ইয়াবা পাচার রুট, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আগুন, সাঁওতাল উচ্ছেদ, সর্বোচ্চ আদালতে দুই মন্ত্রীর দণ্ডিত হওয়া সহ মন্ত্রীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে আওয়ামী লীগ। খোদ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বারবার এনিয়ে সতর্কতা উচ্চারণ করছেন। সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে কাউকে ডেকেও সতর্ক করেছেন ওবায়দুল কাদের। শুধু তাই নয়, আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হবে না, এমন অন্তত ৭০ জন বর্তমান মন্ত্রী ও এমপির তালিকাও করা হয়েছে বলে জানা যায়।

নির্বাচনে এমপিদের বিরুদ্ধে বিরোধীরা মূলত প্রচারণা চালাবে এলাকাভিত্তিতে। কিন্তু মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে প্রচারণা চলবে দেশব্যাপী। তাই মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগকে প্রধান ভেবে করণীয় ঠিক করছে আওয়ামী লীগ।

মন্ত্রীদের মধ্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার সন্তোষজনক সমাধান করতে পারেননি। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ বড় বড় ঋণ কেলেঙ্কারিতে অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েছে বাংলাদেশের সরকারি ব্যাংকগুলো। এর কোনো সমাধান দিতে পারেননি অর্থমন্ত্রী। তাছাড়া শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির ঘটনাও এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁর অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে।

আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা নিয়ে গত নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছিলেন ওয়াকার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। এরপর তিনি বেসরকারি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন। তাঁর আমলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে একের পর এক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগের সর্বশেষ প্রকাশিত ঘটনাটিও হয়েছে বাংলাদেশ বিমানে। রাষ্ট্রীয় এই বিমানে চড়ে বিদেশে যাওয়ার সময় বিমানের নাটবল্টু ঢিল করে রাখা হয়েছিল। এছাড়াও বিমানের পাহাড়সম দুর্নীতির কোনো সমাধান দিতে পারেনিন বিমানমন্ত্রী।

এছাড়া, সুপ্রিম কোর্ট দেশের সব বেসরকারি স্কুল-কলেজে এমপিদের ক্ষমতা বলে সভাপতির পদে থাকার পথও বন্ধ করে দিয়েছে। এই মামলাটিও শুরু হয়েছিল রাজধানীর ভিকারুন্নিসা স্কুলের সভাপতি পদে রাশেদ খান মেননের থাকার কারণে। এই বিষয়েও সমালোচনা আছে তাঁর বিরুদ্ধে।

ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে হজ অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে। গত দুবারই হজ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হয়েছে তাঁর মন্ত্রণালয়। এবারও এই ঘটনা ঘটলে তা হবে হ্যাটট্রিক।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা করতে না পারার, অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেওয়াসহ নানা অভিযোগ। তা ছাড়া দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারাধীন বিষয়ে মন্তব্য করে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। যার ফলে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়েছিল ওই সময়।

মৎস ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার স্থানীয় রাজনীতি কারণে সংখ্যালঘু হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছিল মৌলবাদীরা। ওই সময় মন্ত্রী সংখ্যালঘুদের ‘মালাউন’ বলে গালি দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ আছে। এ কারণে সরকারকে কেবল দেশে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গণেও বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল বলে মনে করছেন অনেকে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নিজের মন্ত্রণালয় নিয়ে কোনো অভিযোগ না আসলেও দলীয় কার্যক্রম নিয়ে রয়েছে অভিযোগ। বিশেষ করে সম্প্রতি একজন সংসদ সদস্যকে তিনি প্রহার করেছেন বলে অভিযোগ আছে। তাছাড়া কখনো গাড়িচালককে কান ধরে উঠবস করিয়ে আবার কখনো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারিকে প্রহার করে সমালোচিত হন দলের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজেই।

টানা দ্বিতীয় মেয়াদে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে ক্রমেই বাড়ছে সাংবাদিকদের দূরত্ব। এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ দিনেও অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা না করা, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমকে ওয়েজবোর্ডের আওতায় আনতে ব্যর্থ হওয়া ও নবম ওয়েজবোর্ড গঠন না করা।

তিস্তাচুক্তি করতে না পারায় সমালোচিত পানি সম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদও। এছাড়াও ওই মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে আছে নানা অনিয়মের অভিযোগ।

আর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ছিল এক ভিন্ন উচ্চতায়। বর্তমান বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেনে মঞ্জুর আমলে সরকার আছে শূণ্যের কোঠায়। উপরন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে সুন্দরবন ইস্যুতে দেশে-বিদেশে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় আছে সরকার। এটিকে নির্বাচনে জোরেসোরে কাজে লাগাবে সরকারবিরোধীরা।

প্রথমবার সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি ও পয়লা জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিতে পারার পর টানা দ্বিতীয় মেয়াদে এবারও শিক্ষামন্ত্রী হন নুরুল ইসলাম নাহিদ। তবে এবার হেফাজতের চাওয়া অনুসারে পাঠ্যপুস্তক তৈরি করা ও অব্যাহতভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে সমালোচিত তিনি।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান পরিবহন শ্রমিকদের বিভিন্ন আন্দোলনে নিজেকে জড়িয়ে বারবার সমালোচিত হচ্ছেন।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সময় বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের দ্বন্দ্ব ক্রমেই প্রকাশ হতে থাকে। তাই প্রধান বিচারপতির বিভিন্ন সময় দেওয়া বক্তব্য একত্রিত করে বিচার বিভাগ স্বাধীন নয় বলে নির্বাচনের সময় ইস্যু তুলবে বিরোধীরা।

দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীকে মন্ত্রণালয় নিয়ে সমালোচনার মুখোমুখি সাম্প্রতিক আগাম বন্যার ফলে হাওরাঞ্চলের মানুষের দূর্ভোগের কারণে। আগাম সতর্কবার্তা দিতে পারলে কৃষক হয়ত আগেই কিছু ফসল হলেও কেটে ঘরে তুলতে পারত।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নানা সফলতা থাকলেও ভারতের সঙ্গে তিস্তাচুক্তি করতে না পারার জন্য সমালোচনার ভাগ নিতে হচ্ছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসাল মাহমুদ আলীকে।

রেলের তেমন কোন উন্নতি না হওয়ায় সমালোচনা আছে রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হকের বিরুদ্ধেও। এছাড়া এলাকার মানুষদের রেলের চাকরিতে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে হেফাজতের চাওয়া অনুসারে পরিবর্তনের কারণে সমালোচিত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমানও।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রয়েছে বিদেশে নতুন শ্রমবাজার তৈরির করতে না পারার অভিযোগ।

খাদ্যমন্ত্রী মো. কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ ব্রাজিল থেকে পঁচা গম আমদানির। ২০১৫ সালে এই নিয়ে সরকারকে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছিল। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে তিনিও সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে দণ্ডিত।

তাছাড়া প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের কর্মকাণ্ডের জন্যও সমালোচিত সরকার। তাদের মধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য শাহরিয়ার আলম এবং পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শরীফ নিজেদের বিতর্কিত করেছেন এলাকায় নিজেদের আগমন উপলক্ষে স্কুল শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে। নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয় সমালোচিত হয়েছেন অস্ত্রসহ উত্তরার একটি বাড়িতে হামলা চালাতে গিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। খুলনা-৬ আসনের এমপি শেখ মো. নূরুল হকের বিরুদ্ধে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে মামলা হয়েছে।

কম্পিউটারে ফটোশপের মাধ্যমে চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য এম আবদুল লতিফ নিজের শরীরের অংশের ছবির সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুখমণ্ডলের ছবি লাগিয়ে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ এসেছে গণমাধ্যমে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতবাড়িতে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মৎস ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হকের সঙ্গে নাম আসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীরও। গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ সমালোচিত হন গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীতে হামলার ঘটনায়।

টাঙ্গাইল-৩ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানার বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যা মামলা।

ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য রহিম উল্যাহর বিরুদ্ধে দলীয়কর্মী আজিজুল হককে গুলি করে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

বাংলা ইনসাইডার / এমএএম