ঢাকা, মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

নতুন দ্বার উন্মোচন করছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০১৭ শুক্রবার, ১০:০০ এএম
নতুন দ্বার উন্মোচন করছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট

এগিয়ে চলেছে দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ এর নির্মাণকাজ। বর্তমান কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১৬ ডিসেম্বর স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হতে পারে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে উপগ্রহ যুগে ওই দিন থেকেই বাংলাদেশ পথ চলবে।

ফ্রান্সে ইতিমধ্যে এই স্যাটেলাইটটি তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। এখন এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। সবকিছুই সময়মতো বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে সার্বিক প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। সফলভাবে এই উপগ্রহ মহাকাশে গেলে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হবে বাংলাদেশ।

মহাকাশে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থান করবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। এই কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশ ছাড়াও সার্কভুক্ত সব দেশ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমিনিস্তান ও কাজাখস্তানের কিছু অংশ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের আওতায় আসবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করা হবে।

সূত্র মতে, ২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপণে ‘স্যাটেলাইট সিস্টেম’ কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেয়। ২০১৫ সালে মূল স্যাটেলাইট তৈরির কাজ শুরু হলেও এর প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয় আরও তিন বছর আগে ২০১২ সালে।

যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল (এসপিআই) এই প্রকল্পে ২০১২ সাল থেকে বিটিআরসির পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত এসপিআই পরামর্শক হিসেবে কাজ করবে। আর স্যাটেলাইট তৈরির এই পুরো কর্মযজ্ঞটি চলছে বিটিআরসির তত্ত্বাবধানে। এসপিআইয়ের পরামর্শেই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, অর্থায়ন, দরপত্র, অরবিটাল স্লট কেনাসহ অন্য সব কাজ করেছে বিটিআরসি।

প্রস্তাবিত স্যাটেলাইটের মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে। এই ট্রান্সপন্ডারের মাধ্যমে ভয়েস, ডেটা ও ভিডিও সিগন্যাল গ্রহণ ও প্রেরণ করা যাবে। ৪০ টির মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। বাকি ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির জন্য রাখা হবে।

তিনটি ধাপে এই নির্মাণকাজ চলছে। এগুলো হলো স্যাটেলাইটের মূল কাঠামো তৈরি, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণের জন্য গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি।

স্যাটেলাইট তৈরি হচ্ছে ফ্রান্সের মহাকাশ সংস্থা থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেসে। থ্যালেসে স্যাটেলাইট তৈরির কাজ শেষে এটি উৎক্ষেপণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পাঠানো হবে। সেখানে আরেক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্সের ‘ফ্যালকন-৯’ রকেটে করে স্যাটেলাইটটি মহাকাশে পাঠানো হবে।

স্যাটেলাইট ওড়ানোর কাজটি বিদেশে হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশ থেকেই। এ জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন (ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা) তৈরির কাজ চলছে। বাজার মূল্যায়ন, বাজারজাতকরণ, বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ, গ্রাউন্ড স্টেশন ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজ করছে এসপিআই।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে দেওয়া হচ্ছে ১ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। আর ঋণ হিসেবে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি দিচ্ছে বাকি ১ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা।

মাত্র সাত বছরেই বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের খরচ ৩ হাজার ২৪৩ কোটি টাকার পুরোটাই উঠে আসবে বলে হিসাব করা হয়েছে। বিটিআরসির হিসাব অনুযায়ী, স্যাটেলাইট থেকে আয়ের ৭০ শতাংশ আসবে বিদেশ থেকে। বাকি ৩০ শতাংশ আয় আসবে স্থানীয় পর্যায় থেকে।

স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের এক সপ্তাহ আগে থেকে কাউন্টডাউন করে প্রচার চালানো হবে এবং উৎক্ষেপণ সরসারি সম্প্রচার করা হবে। মহাকাশে যাওয়ার পর স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বঙ্গবন্ধু কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট বাংলাদেশ (বিসিএসবি) কোম্পানি লিমিটেড নামের একটি কোম্পানি গঠনের কাজ এখন চলছে। এটির লোকবল নিয়োগ ও তাঁদের প্রশিক্ষণের জন্য থ্যালেসের সঙ্গে ২০২০ সাল পর্যন্ত চুক্তি আছে।

ইতোমধ্যেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি ৮৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড স্টেশনের কাজ শেষ হয়ে যাবে। অক্টোবরের মধ্যে ইকুইপমেন্ট টেস্টিং শুরু হবে। গ্রাউন্ড স্টেশনের মধ্যে ১০ টন ওজনের দুটি অ্যান্টেনা স্থাপন করা হয়েছে এবং ভবন তৈরির কাজ প্রায় ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। বিদ্যুতের জন্য জেনারেটর স্থাপন ও বিদ্যুৎ সরবরাহে ছয়টি বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ডিসেম্বরে উৎক্ষেপণের আগে নভেম্বর থেকে গ্রাউন্ড স্টেশনের পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হবে।  তাই দীর্ঘপথ পার হয়ে এখন নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে খুব বেশি সময় বাকি নেই।

দেশের নিজস্ব এই উপগ্রহ স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট ও বেতারসহ ৪০ ধরনের সেবা দেবে। ব্রডকাস্টিং থেকে শুরু করে টেলিযোগাযোগের সব সেক্টরেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে। অন্যদিকে স্যাটেলাইটের অব্যবহৃত তরঙ্গ ভাড়া দিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করাও সম্ভব হবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর কার্যক্রম শুরু করলে আশপাশের বেশ কয়েকটি দেশে টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা দেয়ার জন্য জিয়োসিক্রোনাস স্যাটেলাইট সিস্টেম এর গ্রাউন্ড সিস্টেমসহ সব ধরনের সেবা পাওয়া যাবে। এতে দেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবার পাশাপাশি টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-এডুকেশন, ডিটিএইচ (ডিরেক্ট টু হোম) ইত্যাদি সেবা প্রদান করা হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ টেরিস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সারাদেশে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা বহাল থাকা, পরিবেশ যোগাযোগ মাধ্যম হিসাবে ই-সেবা নিশ্চিত করাসহ স্পেস টেকনোলজির জ্ঞানসমৃদ্ধ মর্যাদাশীল জাতি গঠনেও অনবদ্য ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট।

বর্তমানে বিদেশী স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ প্রতিবছর প্রায় ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিতে হচ্ছে। নিজস্ব স্যাটেলাইট স্থাপন হলে এই টাকা সাশ্রয় হয়েও আর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ স্যাটেলাইটে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে, যার ২০টি বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে এবং বাকিগুলো ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।

একইভাবে স্থানীয় আয়ের মধ্যে ২৪টি স্যাটেলাইট টিভি থেকে বছরে আসবে অন্তত দেড় কোটি ডলার। এ পরিমাণ অর্থ প্রতি বছর হংকং ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে চলে যাচ্ছে। নিজেদের স্যাটেলাইট চালু হলে এসব চ্যানেলের তখন বিদেশি স্যাটেলাইট ব্যবহার করতে হবে না। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের পর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগসহ অন্যান্য সেক্টরে উন্নত দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে যাবে। তখন আর বিদেশী স্যাটেলাইটের উপর আমাদের নির্ভরশীল হতে হবে না।

বাংলা ইনসাইডার/এসএম/জেডএ




 

বিষয়: জাতীয়