ঢাকা, মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

‘বিএনপিতে চলছে রাজতন্ত্র, আমি ক্রীতদাস’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০১৭ বৃহস্পতিবার, ০৯:০০ পিএম
‘বিএনপিতে চলছে রাজতন্ত্র, আমি ক্রীতদাস’

এলিফ্যান্ট রোডের বাড়ি থেকে আজকাল খুব একটা বের হন না। বাড়িতে কর্মীদেরও আনাগোনা নেই। বলা যায় অবসর জীবন যাপনই করছেন। দলের নেতারাও আজকাল তাঁর খোঁজ খবর নেন না। অথচ ক’দিন আগেও জেল খাটলেন। নেতারা তাঁর খবরও নেয়নি তখন। আত্মীয় স্বজনরাও এটা ভালোভাবে নেয়নি। তাঁরা অভিযোগ করছেন ‘বিএপির জন্য তো কত কিছুই করলেন, বেগম জিয়া তো আপনার খবরও নেয় না’। উত্তরে ম্লান হেসে বলেছেন ‘বিএনপিতে তো রাজতন্ত্র। রানি আর যুবরাজ দল চালায়। আর বাকী সবাই প্রজা, কেউ কেউ ক্রীতদাস। আপনি কি- এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন আরও দার্শনিক ভাবে, বলেছেন ‘রানি এবং যুবরাজকে যারা খাজনা দিতে পারে তারা প্রজা, আর যারা পারে না, তারা তো ক্রীতদাসই। আমিও ক্রীতদাস’। এম কে আনোয়ার। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। ডাকসাইটে আমলা ছিলেন, মন্ত্রী ছিলেন দু’দফায়। এখন শরীর এবং মন দুয়ই ধুঁকছে। প্রতিদিন অপেক্ষা করছেন মৃত্যুর।

এম কে আনোয়ারের রাজনীতিতে আসাটা ছিল এক বিস্ময়। ৯০ এর ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হলো। তিন জোটের পক্ষ থেকে এরশাদের দোসরদের তালিকা প্রকাশিত হলো। তালিকায় নাম ছিল দুজন সচিবের। একজন প্রয়াত কেরামত আলী অন্যজন এম কে আনোয়ার। এরা দুজনই এরশাদের আস্থাভাজন সচিব ছিলেন। তিন জোটের ঘোষণায় বলা হয়েছিল ‘এরশাদের দোসরদের কেউ কোনো রাজনৈতিক দলে নেবে না, মনোনয়নও দেবে না’।

ডিসেম্বরের এক সকালে প্রধানমন্ত্রীর ৩২ নম্বরে ওই দুই এরশাদের দোসর আমলাকে নিয়ে এলেন তোফায়েল আহমেদ। আওয়ামী লীগ সভাপতি তখন প্রচণ্ড ব্যস্ত। মনোনয়ন, নির্বাচনী ইশতেহার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বৈঠকের পর বৈঠক হচ্ছে। তোফায়েল আহমেদ শেখ হাসিনাকে বললেন, কেরামত আলী এবং এম কে আনোয়ার এসেছেন, তারা নমিনেশন চায়। আসন্ন নির্বাচনে বিজয় নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো সংশয় নেই। নির্বাচন যেন কেবল এক আনুষ্ঠানিকতা। শেখ হাসিনা একটু রেগেই গেলেন। তিনি ওই দুই আমলার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেও অস্বীকৃতি জানালেন। বললেন ‘এরশাদের কোনো দোসরকে দলে নিয়ে আমি মানুষের কাছে ভোট চাইবো কীভাবে?

ব্যস। শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে ব্যর্থ হয়ে দুজনই চলে গেলেন, বেগম জিয়ার কাছে। দেখাতো পেলেনই, সঙ্গে দুজনই পেলেন বিএনপির টিকিট। নির্বাচনে অবিশ্বাস্য ভাবে জয়ী হলো বিএনপি। জামাতের সমর্থনে সরকারও গঠন করল। বেগম জিয়ার মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পেলেন, এরশাদের ঘনিষ্ঠ দুই আমলা।

কুমিল্লার হোমনায় এম কে আনোয়ার আগে থেকেই জনপ্রিয় ছিলেন। সচিব থাকার ফায়দা নিয়ে এলাকায় রাস্তাঘাট বিদ্যুৎ করেছিলেন। আমলা থেকে মন্ত্রী হলেন কোনো বিরতি ছাড়াই। মন্ত্রণালয়ের কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় মন্ত্রী হিসেবেও দক্ষতার পরিচয় দেন। অনভিজ্ঞ মন্ত্রিসভায় তিনি হয়ে ওঠেন গুরুত্বপূর্ণ। ৯৬ তে বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হয়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু এম কে আনোয়ার ঠিকই এমপি হন। এসময় দলেও তিনি নেতৃত্বে আসেন। মাঠের কর্মীদের কাছে জনপ্রিয় না হলেও, দক্ষ আমলা হবার সুবাধে প্রশাসনিক কাজে বেশ দক্ষতারই পরিচয় দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু নেতার জন্ম হয়, যাঁদের মধ্যে আদর্শের কোনো বালাই নেই। মন্ত্রীত্ব বা রাজনীতি তাদের কাছে স্রেফ একটা চাকরি অথবা ব্যবসা। এম কে আনোয়ার নি:সন্দেহে তাদের দলে। কিন্তু জীবন সায়াহ্নে সবাই একটু সম্মান চায়, মর্যাদা চায়। এম কে আনোয়ার হয়তো সেটাই চেয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি এমন একটি দল প্রয়োজন ছাড়া যেখানে আসলে সবাই ক্রীতদাস।

বাংলা ইনসাইডার